Thursday, 7 August 2014

রবীন্দ্রনাথের সারমেয় ভাবনা


রবীন্দ্রনাথের সাথে কুকুরের সম্পর্ক নিয়ে এই রচনার আপাত কোনো প্রাসঙ্গীকতা নেই। তবে রবীন্দ্রনাথ এত বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তাঁর রচনায় কুকুররাই বা বাদ যাবে কেন? বাদ যায়নি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, গল্পে উপন্যাসে সারমেয় জাতি উপস্থিত হয়েছে বিভিন্ন পটভূমিকায়। রবীন্দ্রনাথের শিশুপাঠ্যেও যেমন কুকুরের কথা রয়েছে আবার গোরার মত উপন্যাসেও বারবার কুকুরের উল্লেখ রয়েছে। রবীন্দ্র সাহিত্যে কুকুর এসেছে প্রধানতঃ চার ভাবে। তা হলঃ
১) উপমা হিসাবে ২) কাহিনির চরিত্র হিসাবে। ৩) পরিবেশ রচনার খাতিরে, ৪) এবং স্বমহিমায়।
উপমা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ কুকুরকে ব্যবহার করেছেন নিজের বর্ণনায় অথবা কাহিনির চরিত্রের মুখ দিয়ে। যেমন
 “কুকুর মনিবহারা যেমন করুণ চোখে চায়
অবুঝ মনের ব্যথা করে হায় হায় ; (শেষ লেখা - ৪)
কালের যাত্রায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
 “সুতোর থেকে কাপড় ।
ভাগ্যে তাঁর ভিক্ষার ঝুলি অসীম
তাই মানুষ সন্ধান পায় অসীম সম্পদের ।
নইলে দিন কাটত কুকুর-বেড়ালের মতো ।
তোমরা কি বলো, সব চেয়ে বড়ো সন্ন্যাসী ওই কুকুর-বেড়াল”

গোরা কহিল, “কেন চাইব না? কিন্তু পরিবর্তন তো পাগলামি হলে চলবে না। মানুষের পরিবর্তন মনুষ্যত্বের পথেই ঘটেছেলেমানুষ ক্রমে বুড়োমানুষ হয়ে ওঠে, কিন্তু মানুষ তো হঠাৎ কুকুর-বিড়াল হয় না। (গোরা)
বিনোদবিহারী  -না বিয়ের পর থেকে দারিদ্র্য বলে একটা কদর্য মড়াখেকো শ্মশানের কুকুর জিব বের করে সর্বদা আমার চোখের সামনে ..( গোড়ায় গলদ - তৃতীয় অঙ্ক - দ্বিতীয় দৃশ্য) , ৩৪

রবীন্দ্রনাথ রচনায় কোনো ব্যক্তির প্রতি বিষোদ্গার করেননি ঠকই, কিন্তু কারও অন্যায়, বিশেষতঃ কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় ভারত বা বাঙ্গালী জাতীর প্রতি অবমাননাকর কোনও রচনা প্রকাশ করলে তার প্রতিবাদ রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই করেছেন। স্যার  লেপেল গ্রিফিনের লেখা বাঙ্গালী জাতীর প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রবন্ধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ খেঁকি কুকুরের তুলনা এনেছেন।
“কুকুর-সম্প্রদায়ের মধ্যে খেঁকি কুকুর বলিয়া একটা বিশেষ জাত আছে, তাহাদের খেঁই খেঁই আওয়াজের মধ্যে কোনোপ্রকার গাম্ভীর্য অথবা গৌরব নাই। কিন্তু সিংহের জাতে খেঁকি সিংহ কখনো শুনা যায় নাই। সার লেপেল গ্রিফিন জুন মাসের ফর্ট্‌নাইট্‌লি রিভিয়ু পত্রে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যে-একটা প্রবন্ধ লিখিয়াছেন তাহার মধ্যে ভারি-একটা খেঁই খেঁই আওয়াজ দিতেছে। ইহাতে লেখকের জাতি নিরূপণ করা কিছু কঠিন হইয়া পড়িয়াছে”।

কুকুর দীর্ঘকাল ধরে মানুষের সাথী। রবীন্দ্র সাহিত্যে মানুষ ও কুকুরের এই সখ্যতা ধরা পড়েছে বহুবার।
অঞ্জনা নদী তীরে চন্দনী গাঁয় কবিতাটা হয়তো সকলেরই মনে আছে। সেখানে এই লাইনটি আছে, “আত্মীয় কেহ নাই নিকট কি দূর, আছে এক ল্যাজ-কাটা ভক্ত কুকুর” এখানে কুকুর এসেছে দুটো কারণে একটা অন্তঃ মিলের কারণে,  নিকট কি দূরের সাথে, ভক্ত কুকুর এনে মিলিয়েছেন। কিন্তু সেই সাথে অন্ধ কুঞ্জ বিহারির গল্পও বলা হয়ে গেল। কুকুর এসে কুঞ্জবিহারির নিঃসঙ্গতা দূর করেছে।

জীবনস্মৃতির বিলাত পর্বে রবীন্দ্রনাথ একটি পরিবারে কুকুরের অবস্থান ও তার ভুমিকা নিয়ে লিখেছেন, “বার্কার-জায়ার সান্ত্বনার সামগ্রী ছিল একটি কুকুরকিন্তু স্ত্রীকে যখন বার্কার দণ্ড দিতে ইচ্ছা করিতেন তখন পীড়া দিতেন সেই কুকুরকে। সুতরাং এই কুকুরকে অবলম্বন করিয়া মিসেস বার্কার আপনার বেদনার ক্ষেত্রকে আরো খানিকটা বিস্তৃত করিয়া তুলিয়াছিলেন” মানুষের সাথি ও কাহিনির চরিত্র হিসাবে কুকুরের এই আগমন।

গোরা উপন্যাসের একটি চরিত্র সতীশ কুকুর প্রেমিক তাই এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ কুকুরের প্রসঙ্গ এনেছেন এই ভাবে-
সতীশ হঠাৎ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা বিনয়বাবু, আপনার কুকুর নেই?”
বিনয় হাসিয়া কহিল, “কুকুর? না, কুকুর নেই।
সতীশ জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, কুকুর রাখেন নি কেন?”
বিনয় কহিল, “কুকুরের কথাটা কখনো মনে হয় নি।

আরেক জায়গায় এই ঘটনাটি আছে-
এমন সময় সতীশ তাহার অচিরজাত কুকুর-শাবকটাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া লাফাইতে লাফাইতে আসিয়া উপস্থিত হইল। হরিমোহিনী ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “বাবা সতীশ, লক্ষ্মী বাপ আমার, ও-কুকুরটাকে নিয়ে যাও বাবা!
সতীশ কহিল, “ও কিছু করবে না মাসি! ও তোমার ঘরে যাবে না। তুমি ওকে একটু আদর করো, ও কিছু বলবে না।
হরিমোহিনী সরিয়া গিয়া কহিলেন, “না বাবা, না, ওকে নিয়ে যাও।
তখন আনন্দময়ী কুকুর-সুদ্ধ সতীশকে নিজের কাছে টানিয়া লইলেন। কুকুরকে কোলের উপর লইয়া সতীশকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি সতীশ না? আমাদের বিনয়ের বন্ধু?”
দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রসাহিত্যে কুকুর চরিত্র হিসাবেও উপস্থিত এবং তার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। গোরা উপন্যাসের এই পর্বে কুকুর আনন্দময়ী ও হরিমোহিনীর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে।
রবীন্দ্রনাথের অঙ্কিত চরিত্রগুলির মধ্যে কুকুরের প্রতি ভালোবাসা পরিলক্ষিত হয়েছে অনেক জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রেই কুকুর পারিবারিক সদস্যের রূপও পেয়েছে।যোগাযোগ গল্পে আমরা তারই আভাস পাই।

পাশে বসে কুমু নিজের দুই ঠাণ্ডা হাতের মধ্যে দাদার শুকনো গরম হাত তুলে নিলে। বিপ্রদাসের টেরিয়র কুকুর খাটের নীচে বিমর্ষ মনে চুপ করে শুয়ে ছিল। কুমু খাটে এসে বসতেই সে দাঁড়িয়ে উঠে দু পা তার কোলের উপর রেখে লেজ নাড়তে নাড়তে করুণ চোখে ক্ষীণ আর্তস্বরে কী যেন প্রশ্ন করলে। (যোগাযোগ)

ঝাঁকড়া-চুলে-দুই-চোখ-আচ্ছন্নপ্রায় ক্ষুদ্রকায়া ট্যাবি-নামধারী কুকুরসে একবার ঘ্রাণের দ্ববারা লাবণ্য ও সুরমার পরিচয় গ্রহণ করেছে। ... (শেষের কবিতা -১৫, ৬১)

শেষ সপ্তকের ৩২ নং কবিতায় রয়েছে এই লাইনটি কুকুর ডেকে উঠল অকারণে ।  নটার ঘণ্টা বাজল দেউড়িতে । ... এখানে কুকুর এসেছে শুধুমাত্র পরিবেশ রচনার খাতিরে। তার আর কোনো ভূমিকা নেই। চিত্রা কাব্যগ্রন্থে সিন্ধুপারে কবিতায় কুকুরের দেখা পাই এইভাবেঃ-
“চিত্রা নির্জন পথ চিত্রিতবৎ , সাড়া নাই সারা দেশে
 রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে ।
শুধু থেকে থেকে ডাকিছে কুকুর সুদূর পথের মাঝে
গম্ভীর স্বরে প্রাসাদশিখরে প্রহরঘন্টা বাজে ।    
 অফুরান পথ , অফুরান রাতি , অজানা নূতন ঠাঁই
অপরূপ এক স্বপ্নসমান , ...
রবীন্দ্র রচনায় কতবার যে কুকুর এসেছে তা গুনে বলার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কুকুরকে কী চোখে দেখেছিলেন? সেকি শুধু ইতর জন্তু হিসাবে? নীচের এই কবিতাটি পড়লে অন্ততঃ তাই মনে হয়।

লেজ নড়ে, ছায়া তারি নড়িছে মুকুরে
কোনোমতে সেটা সহ্য করে না কুকুরে।
দাস যবে মনিবেরে দোলায় চামর
কুকুর চটিয়া ভাবে, এ কোন্‌ পামর?
গাছ যদি নড়ে ওঠে, জলে ওঠে ঢেউ,
কুকুর বিষম রাগে করে ঘেউ-ঘেউ।
সে নিশ্চয় বুঝিয়াছে ত্রিভুবন দোলে
ঝাঁপ দিয়া উঠিবারে তারি প্রভু-কোলে।
মনিবের পাতে ঝোল খাবে চুকুচুকু,
বিশ্বে শুধু নড়িবেক তারি লেজটুকু।
কণিকা ১৮৯৯
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ চিরকালই অনন্য। বার বার তাঁর উত্তরণ ঘটেছে। নিজের জীবন দর্শণ ক্রমশঃ উদ্ভাসিত হয়েছে নব নব উপলব্ধিতে। আমরা তাঁর গানে কবিতায় তারই স্পর্শ পেয়ে থাকি। রবীন্দ্রনাথ রোগশয্যায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন, যা তাঁর জীবন দর্শণের ও মানব জীবনের উপলব্ধির সার। কিন্তু তাও কোথাও কিছু বাকি থেকে গিয়েছিল। তাই কণিকা রচনার চল্লিশ বছর পরে আরোগ্য কাব্য গ্রন্থে তিনি কুকুর নিয়ে চরম উপলব্ধি লিখে গিয়েছেন এই কবিতায়।
 আরোগ্য১৯৪০
প্রত্যহ প্রভাতকালে ভক্ত এ কুকুর
স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে আসনের কাছে
যতক্ষণে সঙ্গ তার না করি স্বীকার
করস্পর্শ দিয়ে ।
এটুকু স্বীকৃতি লাভ করি
সর্বাঙ্গে তরঙ্গি উঠে আনন্দপ্রবাহ ।
বাক্যহীন প্রাণীলোক-মাঝে
এই জীব শুধু
ভালো মন্দ সব ভেদ করি
দেখেছে সম্পূর্ণ মানুষেরে ;
দেখেছে আনন্দে যারে প্রাণ দেওয়া যায়
যারে ঢেলে দেওয়া যায় অহেতুক প্রেম ,
অসীম চৈতন্যলোকে
পথ দেখাইয়া দেয় যাহার চেতনা ।
দেখি যবে মূক হৃদয়ের
প্রাণপণ আত্মনিবেদন
আপনার দীনতা জানায়ে ,
ভাবিয়া না পাই ও যে কী মূল্য করেছে আবিষ্কার
আপন সহজ বোধে মানবস্বরূপে ;
ভাষাহীন দৃষ্টির করুণ ব্যাকুলতা
বোঝে যাহা বোঝাতে পারে না ,
আমারে বুঝায়ে দেয় সৃষ্টি-মাঝে মানবের সত্য পরিচয় ।

Sunday, 20 July 2014

বাহির পথে বিবাগী হিয়া (রাজমহল)


আসুন দেখে যান, আনন্দবাজার পত্রিকায় পাকুড় থেকে লেখা এক ব্যক্তির চিঠি ছাপা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন “এখানে দলদলি পাহাড়ের উপরে বিশাল বিশাল পাথরের কড়ি বর্গা ছড়ানো রায়েছে। কারা পাহাড়ের মাথায় এসব বয়ে নিয়ে এলো? যারা এনেছে তারা কি গ্রহান্তরের মানুষ?”
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, তখন দানিকেনের পপুলারিটির যুগ। দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ?, নক্ষত্রলোকে প্রত্যাবর্তন, ইত্যাদি বইগুলো পড়ে মাথায় নানা ভাবনা ঘুরপাক খায়। বন্ধু দিবাকর বলল, চল ঘুরে আসি।
চিঠিটার মধ্যে আরও অনেক কিছু লেখা ছিল। কিন্তু সেসব আর চোখে পড়েনি। শুধু স্টেশনের নাম বারহারোয়া আর দলদলি পাহাড়ের নাম মাথায় ছিল। একদিন জুন মাসে খুব ভোরে আমি আর দিবাকর নামলাম বারহারোয়া স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে বাস দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দলদলি পাহাড়ে যাব শুনে বলল উঠে আসুন।
বাস বারহারোয়া শহরের ভিতর দিয়ে চলল। পশ্চিমবঙ্গ বিহার (এখন ঝাড়খন্ড) সীমান্তে ছোট্ট শহর, তিন দিকে ঘেরা রাজমহলের পাহাড়। শহর ছাড়িয়ে একটু যেতেই দেখলাম লেখা রয়েছে “ ঘাট আরম্ভ”। ঘাট পেরিয়ে বাস যেখানে এলো তার চারদিক ঘিরে রয়েছে রাজমহলের ফ্ল্যাট টপ পাহাড়ের সারি এর নীচে একটা লতানো নদী, নাম গুমনি। গুমনি নদী রাজমহল পাহাড় থেকে বেরিয়ে গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। গূমনি পার হয়ে কিছু দূর এগোতেই কন্ডাক্টার বলল দলদলি এসে গিয়েছে। আমরা নামালাম। সামনে প্রায় হাজার ফুট উঁচু পাহাড়।
পাহাড় দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। রাস্তার ধার থেকে সটান উঠে গিয়েছে বেশ কয়েকশো ফুট। পাহাড়ের গোড়ায় ঝোপঝাড়ে ঢাকা প্রান্তর। বেশ কিছু দূরে একটা সাঁওতালি গ্রাম। একটা ছোট্ট রাস্তা গ্রামের ভিতর চলে গিয়েছে। গ্রাম পার হতেই দেখলাম পথ শেষ। শুধু মাঠ, বড় বড় কিছু গাছ আর ঝাঁটি বন।

বাংলো থেকে দলদলি পাহাড়

দলদলি পাহাড়ের গোড়া, এখান থেকেই ওঠা শুরু

 দিবাকর বলল, কোনখান দিয়ে উঠবি?    রাস্তা তো দেখছিনা।

বললাম, রাস্তার দরকার নেই, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে যাব। ঠিক একটা পথ পেয়ে যাব।
তাই হল, কিছুটা উঠতেই দেখলাম পাহাড়ের গা বেয়ে একটা খুব শরু পথ উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। কালো কালো পাথরের নুড়িতে ভরা সেই পথ। একজনের বেশি ওই পথ দিয়ে যেতে পারে না।
পাহাড়টা ন্যাড়া নয়। পুরোটাই প্রায় ঘাস আর ছোট গাছে ঢাকা। কিছু কিছু ফল গাছও রয়েছে। তার মধ্যে দেখলাম কদবেল আর আতা গাছ আছে। পাকা ফল দেখলাম না। পাহাড়ের মাথায় উঠতে প্রায় একঘন্টা লেগে গেল।
মাথায় উঠে দেখি নীচে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কিছু দূরে বেশ বড় একটা গঞ্জ মতন রয়েছে। চারপাশে একই রকমের অনেক পাহাড় রয়েছে। পাহাড়গুলির মাথায় বর্ষার মেঘ জমে রয়েছে। আমি ভাবলাম বৃষ্টি হলে তো কোথাও আশ্রয় নেবার উপায় নাই। পাহাড়ের মাথাটা একদম সমতল। মাঠের মত
যাই হোক, যে জন্য আসা সেই পাথরের কড়ি বর্গা কোথায় রয়েছে খুঁজে দেখতে হবে। বেশি খুঁজতে হলনা। বড়বড় ঘাসে ঢাকা মাঠের মধ্যেই কয়েকটা বিশাল বড় পাথরের থাম পড়ে রয়েছে। এক একটা ছয় সাত ফুট লম্বা, আর ছয়কোনা। সব কটিই বেসাল্টের কলাম।
বেসাল্টের কলাম দেখে বিশেষ বিষ্মিত হলাম না। কারণ রাজমহলের প্রতিটি পাহাড় আগ্নেয় শিলা দিয়ে তৈরি। আজ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে এখানে আগ্নেয় প্রবাহ ঘটেছিল। বারবার পরতে পরতে। বহু হাজার বছর ধরে। বেসাল্ট জমে যাওয়ার পরে যখন ঠান্ডা হয় তখন সংকুচিত হওয়ার কারণে তার মধ্যে ছয়কোনা ফাটল তৈরি হয়। এই ফাটলগুলি বেশ কিছু গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ফলে সেগুলি যখন ভেঙ্গে যায় অনেকটা ছয়কোনা পাথরের পিলারের আকার নেয়। স্বাভাবিকভাবেই। এর পিছনে পৃথিবী বা গ্রহান্তরের মানুষের হাত নেই।
কিন্তু এই পাথরগুলো এই পাহাড়ের মাথায় এভাবে সাজিয়ে রাখল কারা? এর পিছনে তো মানুষের হাত রয়েছে। কারা এই ভারি পাথরের পিলারগুলি বয়ে আনল, আর কেনই বা আনল? এক জায়গাতেই এই রকম কয়েকটা পাথর দেখলাম। বাকি পাহাড়ের মাথায় কিছুই নেই। শুধু ঘাসবন আর ঝাঁটির ঝোপ। আমার মনে কিরকম যেন সন্দেহ দেখা দিল। এই পাথর যারা এনেছে তারা এখনকার আধুনিক মানুষ নয়। হয়তো এখানে বহু প্রাচীন মানুষের বাস ছিল।
 যাই হোক, পাহার তো দেখা হল। পাথরের কড়িবর্গারও সন্ধান পেলাম। এবার নামার পালা। পাহাড় থেকে নীচে তাকাতেই বুঝলাম যে পথে এসেছি সে পথে নামা সম্ভব নয়। নীচের দিকে তাকালেই মাথা ঘুরছে। ওঠার সময় উপরের দিকে তাকিয়ে উঠেছি, তাই উচ্চতার ব্যাপারটা টের পাইনি।
 দিবাকর বলল, চল, খুঁজে দেখি কোথাও নিশ্চয়ই ঝর্ণা আছে। সেখান দিয়ে নামা সহজ হবে। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর সত্যিই একটা ঝর্ণা পেলাম। বেশ একটা ভ্যালি মতন আছে। খাড়াইও বেশি নয়। নামা যাবে। তবে পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে হবে।
অরণ্যময় উপত্যকা

 নামার পথে দেখলাম চারপাশে নানা রকমের সুন্দর সুন্দর পাথর পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে অ্যাগেট। অ্যাগেটের ছড়াছড়ি, নানান সাইজের আর নানা রঙের। আর আছে কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল। একটু খুঁজে বেশ কিছু অ্যামেথিস্টের ক্রিস্টালও পেলাম। কিন্তু পাথরের খাঁজ থেক একটা বড়সর পাথর তুলে আমার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। একটা ফ্লিন্ট বা চকমকি পাথরের টুকরো। ফ্লিন্ট এখানে প্রচুর রয়েছে। সর্বত্র ফ্লিন্টের ছড়াছড়ি। কিন্তু এটা একেবারে অন্যরকম। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে এই পাথরে মানুষে হাতের কারিকুরি রয়েছে। যাকে বলে আর্টিফ্যাক্ট। পাথরটাকে হাতে তুলে আমার আর সন্দেহ রইল  না যে এটা একটা হ্যান্ড এক্স বা হাত কুঠার। প্রাচীন প্রস্তর যুগের অস্ত্র।


পাথরের অস্ত্রঃ বর্তমানে জলপাইগুড়ির সায়েন্স ক্লাবের সংগ্রহে আছে

চারদিক নির্জন বহু দূর পর্যন্ত লোকের বসতি দেখা যাচ্ছে না। আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি সেখানে একদিন প্রাচীন প্রস্তরযুগের মানুষেরা এসেছিল। হয়তো শিকার করতে গিয়ে হাত থেকে খসে পড়েছিল এই পাথর। আজ এতকাল পরে সেটি আমার হাতে উঠে এসছে।
পাহার থেকে নামার পথে আর একটা ফ্লিন্টের টুকরো কুড়িয়ে নিলাম । এটা হাত কুঠার নয়, আকারেও ছোটো। কিন্তু পাতলা এই পাথরের ধারগুলি বেশ নিপুনতার সাথে ভেঙে ধারালো করা হয়েছে। ঘড়িতে দেখলাম প্রায় দুপুর একটা। বেশ খিদে পেয়েছে। খেতে গেলে যেতে হবে পাহাড়ের মাথা থেকে যে গঞ্জটা দেখা যাচ্ছিল সেখানে।
গঞ্জ পর্যন্ত হেঁটে যেতে আরো এক ঘন্টা লাগল। গঞ্জটা বেশ বড়ই। নাম বারহেট। পাকুড় থেকে দুমকা যাওয়ার পথে পড়ে। এটা একটা ব্লক হেডকোয়াটার্সও বটে। থানা আছে। ভাষা মূলতঃ বাংলা চলে। সেই সময়টা বড় সুন্দর ছিল। মানুষের মনে ভয়, সন্দেহ এসব কম ছিল। সহজেই বেশ কিছু লোকের সাথে আলাপ হয়ে গেল। তাদের কাছে শুনলাম এখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে গুমনি নদী পার হয়ে গেলে একটা গুহা আছে। তার মাম শিবগদ্দি। লোকে সেখানে শিব পুজা করতে যায়। কথিত আছে গুহাটা নাকি সাহেবগঞ্জ পর্যন্ত ছিল। ইংরেজরা সেটা বন্ধ করে দিয়েছে। এই বারহেটে একটা পুকুর আছে, তার ধারে মাটিতে খুঁজলে পাথরের চাল, ডাল ইত্যাদি পাওয়া যায়।
পাথরের অস্ত্র সংগ্রহের জায়গা
 খাওয়াদাওয়ার পর পুকুরের ধারে গিয়ে মাটি খুঁড়ে কিছু পাথরের চাল আর ডাল সংগ্রহ করলাম। একজন আমাদের জানালো কোন এক সাধুর অভিশাপে নাকি এখানে সমস্ত খাদ্য শষ্য পাথর হয়ে গিয়েছে।
সেবার বারহেটে রাত্রিবাস করিনি। সে রাত্রেই কোলকাতা ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঐ পাথরে অস্ত্র আর চালডালের রহস্য মাথার মধ্যে ঘুরতেই থাকল কয়েকদিন ধরে। পাথরের অস্ত্রগুলি দেখালাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ব বিভাগে। তাঁরা ওগুলিকে প্রাচীন প্রস্তর যূগের অস্ত্র বলেই সনাক্ত করলেন। বললেন আমারা আগে নাকি আর কেঊ এটা সম্বন্ধে রিপোর্ট করেনি।
এক মাস পরে আবার গেলাম বারহেট। এবার একটু থাকার প্রস্তুতি নিয়ে। আমার সাথে এলো নৃতত্বের একজন গবেষক, সোমনাথ। আমরা ওখানে আরো কিছু প্রাচীন প্রস্তর যুগের সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পেলাম। প্রচুর অস্ত্রও সংগ্রহ করলাম।
এরও কয়েক বছর পরে আবার গেলাম সেখানে। তখন বারহেট অনেক বদলেছে। গুমনি নদীতে একটা বাঁধের নির্মানকার্য চলছে। একটা বাঙলোও হয়েছে, যেখানে রাত্রীবাস করা যায়। গুমনি পায়ে হেঁটে পেরিয়ে শিবগাড্ডি পাহাড়ে গেলাম। ভারি সুন্দর জায়গা। বিশাল বেসাল্টের ক্লিফের নীচে একটা গুহা। গুহার মাথার উপরে বেসাল্টের কলাম ঝুলছে। একটা মন্দির আছে। কিন্তু বিশেষ লোকজনের দেখা পেলামনা।
এর পরে আরো কয়েকবার সেখানে গিয়েছি। মূলতঃ কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল আর জিওড সংগ্রহ করার জন্য। অনেক বন্ধুদের সাথে নিয়ে গিয়েছি। সকলেরই খুব পছন্দ হয়েছিল ওই নির্জন পরিবেশ।
সব শেষে গেলাম ২০০৬ এ। প্রথম দেখার প্রায় ত্রিশ বছর পরে। গিয়ে দেখলাম বারহেট থেকে শিবগাড্ডি পর্যন্ত পাকা রাস্তা হয়ে গিয়েছে। অটো চলে। যে প্রাকৃতিক নির্জনতা ছিল তা অন্তর্হিত। রাস্তার উপর এক বিশাল তোরণ বানানো হায়েছে শিবগাড্ডির যাত্রীদের আকর্ষন করার জন্য। শিবগাড্ডিতে স্কুল হয়েছে পান্থশালা হয়েছে। মোবাইল টাওয়ার বসেছে।  কিন্তু ধার্মিক মানুষেরা গুহার মুখটি গ্রিল আর লোহার দরজা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। এই গুহা আগ্নেয় প্রবাহের ফল স্বরূপ প্রাকৃতিক কারণেই জন্মেছিল। লাভা প্রবাহের বাইরেটা জমে শক্ত হয়ে যাওয়ার পরে এই গুহামুখ দিয়ে ভিতরের তরল লাভা বেরিয়ে এসেছিল। হয়তো প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষেরা  এই গুহাতেই আশ্রয় নিত। 
 শিবগাদ্দি : বেসাল্টের গুহা

ধর্মের চাপে আমাদের প্রাগৈতিহাস আর প্রকৃতির ইতিহাস দুইই লুপ্ত হয়ে গেল। 
ইরিগেশন বাংলো
রাত্রে বাংলোতেই ছিলাম। বাংলোটা এখনও একই রকম রয়েছে। তবে খাওয়ার ঘরে ফ্রিজ বসেছে। শোয়ার ঘরে এসি রয়েছে। আমি চৌকিদারকে বললাম এসি চালিয়ে দিতে। তার উত্তরে সে বলল, এখানে সবই আছে, এসি ফ্রিজ, জলের পাম্প ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই পঁচিশ বছরের মধ্যে এখানে বিদ্যুত আসেনি একবারও।



AdSense